ফাল্গুনের এক মিষ্টি সকাল। কাঁচা ঘুমের ঘোর কাটতে না কাটতেই জানলার ওপাশ থেকে ভেসে এল পাড়ার বাঁদরসেনার ‘হোলি হ্যায়’ চিৎকার আর ধপাস করে জলভরা বেলুন ফাটার শব্দ! দোল মানেই তো কাকভোর থেকে শুরু হওয়া রঙের এক পাগল করা নেশা। আমাদের এই রোজকার যান্ত্রিক জীবনে— যেখানে সকালের ভিড় বাস, মাসের শেষের ইএমআই আর বসের চোখরাঙানি ছাড়া বিশেষ কোনো ‘অ্যাডভেঞ্চার’ নেই, সেখানে এই ফাল্গুনী সকালটা যেন একমুঠো উড়ন্ত আবির। চোখের পলকে সব আলস্য ভেঙে দিয়ে কল্পনার জগৎটাকে রাঙিয়ে দেয় নিমেষে।
দোল তো শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে দাগ দেওয়া একটা ছুটির দিন নয়। দোল হলো একটা জীবন্ত আবেগ, একটা আস্ত মহাকাব্য, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পুরাণ, ইতিহাস আর আমাদের ফেলে আসা ছেলেবেলা। চলুন, আজ সকালের এই মিষ্টি রোদ্দুর মাখতে মাখতেই সেই গল্পটা একটু অন্যভাবে শোনা যাক।

ভস্ম থেকে আবিরে: এক অদ্ভুত রূপান্তর

খেয়াল করে দেখেছেন কি, এই রঙের উৎসবের ঠিক আগেই প্রকৃতির কী অদ্ভুত এক রূপান্তর ঘটে? ফাল্গুনের এই মাতাল হাওয়ার ঠিক আগেই আমরা দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনায় মগ্ন থাকি। শিবরাত্রির সেই শান্ত, সমাহিত, নিস্পৃহ বৈরাগ্যের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকৃতি যেন এক লহমায় তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ভোলানাথের ভস্ম যেন হাওয়ায় উড়ে রাতারাতি রূপ নেয় ফাগুনের লাল আবিরে! নিস্তব্ধতার চাদর সরিয়ে হঠাৎ করেই যেন বসন্তের জয়গানে মেতে ওঠে পৃথিবী। শিবের ওই নীরব বৈরাগ্য আর ফাগুনের এই উচ্ছল প্রেম— এই দুয়ের অদ্ভুত এক সন্ধিক্ষণেই তো আমাদের এই মানবজীবন দাঁড়িয়ে আছে।

বৃন্দাবনের ধুলোয় মিশে থাকা প্রেমের উপাখ্যান

একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো সেই দিনটার কথা! যমুনার শান্ত কালো জল, কদম্ব আর তমাল গাছের ছায়ায় ঘেরা এক মায়াবী প্রান্তর। ফাল্গুনের পাগল করা হাওয়া এসে সবে ছুঁয়েছে বৃন্দাবনের মাটি। ঠিক এমন এক মোহময় পরিবেশেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আদিম প্রেমের আখ্যান।
গল্পের শুরুটা বড়ই অদ্ভুত, বড়ই মিষ্টি। ননীচোর, বাঁশিওয়ালা এক শ্যামবর্ণ কিশোরের মনে সেদিন একরাশ অভিমান। নিজের গায়ের কালো রং নিয়ে তার বড় আক্ষেপ। দৌড়ে গিয়ে সে মা যশোদার আঁচল টেনে ধরল। ছলছল চোখে, ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলল— “মা, রাধা এত ফর্সা আর আমি কেন এমন কালো? কালিন্দীর জলের মতো কালো বলে রাধা কি আমায় ভালোবাসবে না?”
ছেলের এমন মিষ্টি অভিমান দেখে মা যশোদা আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। পরম আদরে ছেলেকে কাছে টেনে বললেন, “ওরে আমার বোকা ছেলে! ভালোবাসায় কি আর রঙের বিচার হয়? তোর যদি এতই দুঃখ, তাহলে এক কাজ কর। এই নে রং, গিয়ে তোর নিজের ইচ্ছেমতো রং রাধার মুখে মাখিয়ে দে। দেখবি, তখন আর তোদের দুজনের মাঝে কোনো রঙের ফারাক থাকবে না!”
মায়ের এই একটা কথাই যেন মন্ত্রের মতো কাজ করল। দুষ্টু ছেলেটার চোখেমুখে ফুটে উঠল ফাগুনের রোদ। বাঁশি কোমরে গুঁজে, সখাদের দল জুটিয়ে সে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসল কদম্ব গাছের আড়ালে। ওদিকে যমুনায় জল ভরতে আসছে রাধা আর তার সখীরা। রাধার পরনে নীল শাড়ি, কাঁখে কলসি, আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত মায়া।
হঠাৎ, কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক মুঠো রাঙা আবির এসে পড়ল রাধার ফর্সা গালে। চমকে উঠে রাধা দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে সেই শ্যামল কিশোর। কৃষ্ণ শুধু রং মাখায়নি, ওই আবিরের ছোঁয়ায় সে যেন নিজের সত্তা, নিজের প্রেম, নিজের পুরো অস্তিত্বটাই রাধার মধ্যে মিশিয়ে দিল। রাধাও লজ্জায়, প্রেমে রাঙা হয়ে মুঠো ভর্তি আবির ছুঁড়ে দিল কৃষ্ণের দিকে। কালো আর ফর্সার ভেদাভেদ, অহংকার আর দূরত্বের সব দেয়াল নিমেষে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। দোল তো আসলে সেই পরম মিলনেরই মহাজাগতিক আখ্যান। যেখানে রং নিছক কোনো বস্তু নয়, রং হলো আত্মার ভাষা।

গৌর পূর্ণিমা থেকে শান্তিনিকেতন: বাঙালির নিজস্ব দোল

আমাদের বাংলার মাটিতে অবশ্য দোলযাত্রার গল্পটা শুধু রাধা-কৃষ্ণের নয়। আজ থেকে শত শত বছর আগে, ১৪৮৬ সালের এই ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনেই নবদ্বীপের মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাই বাঙালির কাছে এই দিনটা গৌর পূর্ণিমার— খোল-করতালের তালে, সংকীর্তনের সুরে মেতে ওঠার দিন।
আর এই ভক্তির সাথে যখন একাত্ম হলো বিশ্বকবির ভাবনা, তখন শান্তিনিকেতনের রাঙা মাটিতে জন্ম নিল ‘বসন্ত উৎসব’। “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল…”— এই একটা গানে আজও আমাদের মন কেমন উদাস হয়ে ওঠে। মনে হয়, যেন এই কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে এখনই ছুটে যাই সেই পলাশ আর শিমুলের দেশে। আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দোলের দিন সকালে হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবির যে বন্যা বয়, তা দেখে কবিগুরু স্বর্গে বসে মুচকি হাসেন কি না, কে জানে!

ফিরে দেখা সেই ভূত হওয়ার দিনগুলো…

সব শেষে একটু নস্টালজিয়ায় ফেরা যাক। দোল মানেই তো শুধু আধ্যাত্মিকতা নয়, দোল মানেই পাড়ার মোড়ে ওত পেতে থাকা। পুরোনো জামা পরে, জলভরা বেলুন নিয়ে ছাদে লুকিয়ে থাকা, আর সেই ভয়ংকর ‘পাকা রং’ বা রুপোলি রং মুখে মেখে আস্ত ভূত হয়ে যাওয়ার স্মৃতিগুলো কি ভোলা যায়? দোলের পরের দিন স্কুলে বা অফিসে যাওয়ার সময় কানের পেছনে বা ঘাড়ের কাছে লুকিয়ে থাকা সেই জেদি গোলাপি রং যেন আমাদের মনে করিয়ে দিত— “জীবনটা বড্ড রঙিন রে ভাই!” স্নান সেরে উঠে মায়ের হাতের মালপোয়া বা ঘুগনির সেই স্বাদ হয়তো আজকের দামি রেস্তোরাঁর মেনুতেও পাওয়া যাবে না।
আজ হয়তো আমরা অনেকেই নিজের নিজের শহরের চার দেওয়ালে বড় বেশি একা, বড় বেশি ব্যস্ত। তবু, এই দোলের দিন অন্তত সমস্ত কাজের বাহানা ভুলে, পুরোনো অভিমান সরিয়ে রেখে প্রিয়জনদের গালে একটু আবির ছুঁইয়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে— “অনেক ভালো থেকো।”
জীবনটা আসলে রঙেরই একটা ক্যানভাস। সেখানে দুঃখের নীল রং যেমন আছে, তেমনি ভালোবাসার লাল রংটাও আছে। আসুন না, এই দোলযাত্রায় সব পুরোনো গ্লানি ভুলে আমরা একে অপরকে একটু নিজের রঙে রাঙিয়ে নিই।

পাঠকদের প্রতি একটি ছোট্ট প্রশ্ন:

এই লেখাটি পড়তে পড়তে নিশ্চয়ই আপনারও মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার সেই ভূত হওয়ার দিনগুলোর কথা? আপনার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি বা মজার দোলের স্মৃতি কোনটা? নিচে কমেন্ট বক্সে আড্ডা হোক, আজ গল্প হোক শুধু রঙের আর জীবনের!

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Haimanti
Guest
Haimanti
3 months ago

সবচেয়ে মজার স্মৃতি বলতে, একবার এক বন্ধু দাবি করেছিল ওর রং নাকি ‘জলে ধুইলেই সাফ’। বিশ্বাস করে মাখিয়ে নিলাম। স্নান করতে গিয়ে দেখি, জল পড়ছে কিন্তু রং নড়ছে না! শেষমেশ মা সাবান আর স্ক্রাবার দিয়ে এমন ঘষা দিল, মনে হলো গায়ের চামড়াই উঠে যাবে। রং তো পুরোপুরি উঠলই না, উল্টে আমার গায়ের রং হয়ে গেল একটা অদ্ভুত ককটেল কালার🤣🤣🤣🤣🤣

Saju Bairagi
Admin
3 months ago
Reply to  Haimanti

অনেকটা রিলেট করতে পারছি😂😂😂

Priyanti Barai
Member
3 months ago

আর আমার ছোট গল্প কি জানো 😬 মুখে রঙ, মাথায় রঙ, গায়ে রঙ মেখে বাড়ি ফিরে মায়ের বকা খাওয়া ,কারণ এবারই শুরু মায়ের কাজ , আমার গায়ের রঙ গুলো তুলে পরিষ্কার করার পালা ।ছোটবেলার হলি গুলো খুব খুব আনন্দের ছিলো । সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই আমি Sharmi রং নিয়ে বেরিয়ে পরতাম পাড়াতে । আমাদের রংটা থাকতো পিওর আবির কিন্তু আমাদের যারা রং দিতো তারা ও বলতো এটা আবির কিন্তু স্নান করার সময় বুঝতে পারতাম যে মুখ পোড়া হনুমান হয়ে গেছি 🤭আবিরের মধ্যে এমন কোনো রঙ দিয়ে দিয়েছ্ যা দুই তিন দিন ধরে ঘসামাজা করলেও উঠবে না ।😂

Saju Bairagi
Admin
3 months ago
Reply to  Priyanti Barai

হলির দিনে এরকম একটু আধটু চিটিং করলে ঠাকুর পাপ দেয় না🤭

Partho Shikder
Member
3 months ago

ছোট্ট বেলায় অনেক মজাই কোরতাম,কিন্তু যখন একটু বড়ো হোলাম।বাহিরে থাকা শুরু, এরপর আনন্দ জিনিস টা আসোলে ভুলতে শুরু করলাম। কিন্তু, ২০১৯ এর দোল পূর্ণিমার কিছু দিন আগে ছুটিতে বাড়ি এসে দেখলাম এলাকার ছোট বড়ো সবাই দোল নিয়ে অনেক ব্যস্ত আমিও উৎসাহ দেখিয়ে অনেক আনন্দ উপভোগ করলাম। ২০২০ এর দোল পূর্ণিমা যেদিন সেই দিন ই কলেজ খুলে যায় এবং তার আগের দিন আমর বাড়ি থেকে চোলে যেতে হবে দোল এর আনন্দ উপভোগ করতে পারবো না। এটা ভেবে একটু খারাপ ই লাগছিলো, কিন্তু প্রতিটা মানুষের জীবনে কিছু ❤হারামি বন্ধু থাকে। বন্ধু গুলো জানতো নিশ্চয়ই আমি মন খারাপ করে বাড়ি শুয়ে সময় গুণছি কাটার সময় ঢাকার বাস কাউন্টার এ আসবে। হটাৎ করে হারামি বন্ধু গুলো এসে হাজির হাত আর্বি,রং বলছে আজকে আমাদের হোলি কালকে গ্রামীদের, এই বোলে আমাকে রং মাখিয়ে ধরে নিয়ে গেলো। এরপর হোলিখেলা দোল পূর্ণিমা যেদিন থেকে তার এগের দিন।।

Saju Bairagi
Admin
3 months ago
Reply to  Partho Shikder

বাহ্! এটাকেই বলে প্রকৃত বন্ধুত্ব😊এরকম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার💜

6
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x