ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় (অপারেশন এপিক ফিউরি) ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর বিশ্ববাসী এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন শীর্ষ নেতৃত্বকে হারানোর পর ইরান হয়তো পিছু হটবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি এসে এই সংঘাত থামার বদলে আরও ভয়াবহ ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, খামেনেই নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধের বর্তমান রূপ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।

যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট: লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযান

ইরানের সাথে সরাসরি সংঘাতের পাশাপাশি এই যুদ্ধের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে লেবানন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (IDF) সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে “সীমিত” স্থল অভিযান (Ground Operation) শুরু করেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ভেঙে তাদের লিতানি নদীর উত্তরে হঠিয়ে দেওয়াই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

ইরানের পালটা আঘাত ও আইআরজিসি-র (IRGC) কড়া হুমকি

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে শূন্যতা তৈরি হলেও সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত এখন সরাসরি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর হাতে। ইরান নীরব বসে নেই; তারা প্রতিনিয়ত তেল আবিব এবং দক্ষিণ ইসরায়েল লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমবারের মতো তারা এই যুদ্ধে ভয়াবহ ‘সেজিল’ (Sejjil) ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করেছে।
পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত সমস্ত মার্কিন কোম্পানি ও তাদের কর্মীদের অবিলম্বে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আইআরজিসি, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে এক চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

আমেরিকার ধারাবাহিক আক্রমণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অবকাঠামোগুলোতে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ‘খার্গ আইল্যান্ড’ (Kharg Island)-এর তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলোতে আমেরিকা বড়সড় হামলা চালিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে সেখানে আরও আক্রমণ করা হবে বলে হোয়াইট হাউসের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা ও জ্বালানি সংকট

এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের সাধারণ মানুষের পকেটে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল বাণিজ্য পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশছোঁয়া। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA) জরুরি ভিত্তিতে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের রিজার্ভ বিশ্ববাজারে ছাড়ার ঘোষণা করেছে। জ্বালানি সংকট এড়াতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই কিউআর কোড (QR Code) ভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটা?
সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই যুদ্ধ কবে থামবে? আপাতত শান্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইরান যুদ্ধ থামাতে চাইলেও আমেরিকা এখনই কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি নয়, কারণ “শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি আমেরিকার অনুকূলে আসেনি।” অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর (যেমন ওমান বা মিশর) চেষ্টাতেও ইরান বা আমেরিকা কেউই যুদ্ধবিরতির টেবিলে বসতে রাজি হয়নি।

পরিশেষ

খামেনেইয়ের মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, তা পূরণের আগেই পুরো অঞ্চলটি একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের (Regional War) দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কূটনীতির দরজা আপাতত প্রায় বন্ধ। এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা সময়ই বলবে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি যে এক খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x