মহাকালের দরবারে এক রাত:
যেখানে আমি আর আমার
‘মহাদেব’ মুখোমুখি

ঘন কালো রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। আকাশ থেকে শিশির ঝরছে টুপটুপ করে। আর সেই হিম ধরা রাতে হাজার হাজার মানুষ জেগে আছে। কেন মহাদেব? কার জন্য? এক ‘পাগলা ভোলা’র জন্য?

তুমি তো রাজপ্রাসাদে থাকো না, থাকো তো সেই কৈলাসের বরফে আবার কোনোদিন নাকি শ্মশানের ছাইয়ের মাঝে লুটিয়ে। যার গায়ে কোনো সোনার গয়না নেই, আছে হাড়ের মালা আর সাপ। গায়ে মাখা চিতার ভস্ম। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সত্তা তুমি, অথচ কী ভীষণ উদাসীন! কিছুই চাও না। না দামি প্রসাদ, না রেশমি কাপড়। এই রাতেই নাকি সেই উদাসীন যোগী থেকে প্রেমিক হয়ে উঠেছিলে তুমি? মা পার্বতীও যুগ যুগ ধরে তপস্যা করার পর এই রাতেই পেয়েছিলেন তাঁর মহাদেবকে। ভাবা যায়? যিনি সৃষ্টি আর ধ্বংসের মালিক, তিনি আজ বর সেজে আসছেন। প্রকৃতি আর পুরুষের সেই মহামিলনের সাক্ষী থাকতেই তো সবাই সারারাত জাগে।

সবাই আজ সেজেগুজে, উপোস করে, হাতে দুধ-বেলপাতা নিয়ে তোমার মাথায় জল ঢালতে গেছে। কিন্তু আমি? আমি আজ ওই ভিড়ে নেই। আমার শরীরে আজ উপোসের খিদে নেই, গায়ে নতুন পাঞ্জাবিও নেই। কিন্তু বিশ্বাস করো প্রভু, এই ভিড় থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়েও আজ আমি তোমাকে বড্ড বেশি অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, প্রথাগত ওই সব আচারের আড়াল সরে গিয়ে আজ আমরা বড্ড কাছাকাছি। কেন আজ আমি মন্দিরে যাইনি জানো? কারণ, আমি বড্ড ক্লান্ত। শরীর দিয়ে নয়, মন দিয়ে।

আগে ভাবতাম, না খেয়ে কষ্ট করে, লাইনে দাঁড়িয়ে ঘটি ভর্তি জল শিবলিঙ্গে ঢাললেই বুঝি পুণ্য হয়। কিন্তু আজ মনে হয়, সারাদিন অর্থ কামানোর প্রতিযোগিতায় দৌড়ে, ভালো খাওয়া পরা, বড় গাড়ি বাড়ির মোহে আর সবার মন যুগিয়ে, ভালো রাখার চক্রবূহের মহাচক্রে পিষ্ট হয়েও যখন মনে মনে তোমায় বলি—

"প্রভু, সামলে নিও"
—ওটাই তো আসল মন্ত্র।

আবার শুনেছি, কোনো এক যুগে এই রাতেই নাকি সমুদ্র মন্থন হয়েছিল। অমৃতের লোভে সবাই যখন পাগল, তখন উঠে এসেছিল ভয়ংকর হলাহল—বিষ। সৃষ্টিকে বাঁচাতে সেই বিষ তুমি নিজের গলায় ধারণ করেছিলে, হয়েছিলে ‘নীলকণ্ঠ’

আজ যখন আমি তোমার মূর্তিতে জল ঢালছি না, তখনো আমার গলার কাছে একটা দলা পাকানো কষ্ট অনুভব করছি। জানো মহাদেব, আমি তো রোজ একটু একটু করে নীলকণ্ঠ হই। পরিবারের চিন্তা, ক্যারিয়ারের চাপ, আর না-বলতে-পারা হাজারটা অপমানের বিষ রোজ গিলতে হয় আমাকে। কাউকে দেখাতে পারি না, উগড়েও দিতে পারি না—পাছে প্রিয়জনরা ভয় পায়। শুধু গিলে ফেলি। আজকের এই রাতে, আমি আমার সেই না-বলা বিষটুকুই মনে মনে তোমাকে অর্পণ করলাম। তুমি তো জানো, এই বিষ কতটা জ্বালা দেয়। তুমি ছাড়া আর কে বুঝবে এই গোপন যন্ত্রণার কথা?

লোকে বলে, আজ নাকি তোমার প্রলয়ঙ্কর ‘তাণ্ডব’ নাচের রাত। সৃষ্টির ছন্দ আর ধ্বংসের তালের সেই নাচ। আমার মনের ভেতরেও তো রোজ একটা তাণ্ডব চলে প্রভু! রাগ, অভিমান, আর হতাশার তাণ্ডব। আজ আমি উপোস করিনি ঠিকই, কিন্তু মনে মনে তোমার ওই রুদ্র রূপের পায়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আমার কোনো বেলপাতা নেই, নেই দুধ-গঙ্গার জল। কিন্তু আমার জীবনযুদ্ধের যে লড়াই, আমার সততা, আর আমার চোখের জল মনে মনে—এটুকুই আজ আমার অর্ঘ্য। তুমি তো ‘আশুতোষ’, তুমি তো মনের ভাব বোঝো। তুমি নিশ্চয়ই জানো, আমার শরীর আজ মন্দিরে নেই, কিন্তু আমার মনটা পড়ে আছে তোমার ওই ধুলো মাখা চরণে।

রাত গভীর হচ্ছে। চারদিক নিস্তব্ধ। মনে হচ্ছে, ওই অন্ধকার আকাশটাই তুমি।

হে মহেশ্বর, আমি কোনো বর চাই না, ধন-সম্পদ কিচ্ছু চাই না। শুধু একটু শান্তি দাও। আমার মাথার ভেতরের এই কোলাহলটা থামিয়ে দাও। আমাকে সেই শক্তি দাও, যেন তোমার মতো আমিও সব বিষ হজম করে, সব কষ্ট বুকে চেপে রেখেও শান্ত থাকতে পারি, "সবটুকু সয়ে, সবটুকু বয়ে চলতে পারি"। আমার এই একলা লড়াইয়ে তুমি ছাড়া আর কে আছে বলো?

জয় শিব শম্ভু 🔱
🖋️ সাজু
[saju_comments]
4
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x