আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে অভাবনীয় রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী হলো পশ্চিমবঙ্গ। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১২ই মার্চ রাজভবনে (বর্তমানে লোক ভবন) রাজ্যের ২২তম রাজ্যপাল হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এবং তামিলনাড়ুর প্রাক্তন রাজ্যপাল আর এন রবি (R. N. Ravi)। সি ভি আনন্দ বোসের আকস্মিক পদত্যাগের পর তাঁর এই আগমন রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
আসুন বিস্তারিতভাবে জেনে নিই এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, নতুন রাজ্যপালের অতীত এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান: কারা উপস্থিত ছিলেন?

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পল নতুন রাজ্যপালকে শপথবাক্য পাঠ করান। লোক ভবনের সর্দার প্যাটেল ইউনিটি হলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের সিনিয়র মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু।
তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কোনও প্রতিনিধি বা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। শপথ গ্রহণের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন রাজ্যপাল এবং তাঁর স্ত্রীকে ঐতিহ্যবাহী উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান এবং বাংলাকে একটি “সংস্কৃতির পীঠস্থান” বলে উল্লেখ করেন।

সি ভি আনন্দ বোসের আকস্মিক বিদায়

আর এন রবির নিয়োগের ঠিক আগেই গত ৫ই মার্চ আচমকা পদত্যাগ করেন প্রাক্তন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস। তাঁর এই পদত্যাগ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন যে, কেন্দ্র সরকারের চাপেই আনন্দ বোসকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে, যাতে রাজভবনকে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করা যায়।
তবে আনন্দ বোস নিজে এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে, এটি তাঁর “সচেতন সিদ্ধান্ত” (conscious decision)। তিনি তাঁর ১২০০ দিনের কার্যকালকে ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “ক্রিকেটের পরিভাষায় এটি ১২টি সেঞ্চুরির সমান। খেলায় কখন থামতে হয়, সেই নিয়মও জানতে হয়।” তিনি আরও জানান যে, তিনি তাঁর নিজের রাজ্য কেরালায় ফিরে গিয়ে ‘বিকশিত ভারত’ (Viksit Bharat) মিশনের জন্য কাজ করবেন। তবে কলকাতার একনিষ্ঠ ভোটার হিসেবে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে তিনি রাজ্যে ফিরবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কে এই আর এন রবি?

পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল আর এন রবি একজন অত্যন্ত কড়া প্রশাসক এবং প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা হিসেবে পরিচিত:
  • কর্মজীবন: বিহারের পাটনায় জন্মগ্রহণকারী এবং ১৯৭৬ ব্যাচের কেরালা ক্যাডারের আইপিএস অফিসার রবি দীর্ঘদিন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI) এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-তে কাজ করেছেন।
  • নাগা শান্তি চুক্তি: তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগা শান্তি চুক্তিতে (Naga Peace Talks) কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী (Interlocutor) ছিলেন এবং জঙ্গি দমনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
  • তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা: পশ্চিমবঙ্গের আগে তিনি নাগাল্যান্ড, মেঘালয় এবং তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের দায়িত্ব অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন।

নবান্ন বনাম রাজভবন: আগামী দিনে সমীকরণ কোন পথে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আর এন রবির নিয়োগ কেন্দ্রের একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং কৌশলগত পদক্ষেপ। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল থাকাকালীন সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত সর্বজনবিদিত। রাজ্য বিধানসভায় বিল আটকে রাখা থেকে শুরু করে উপাচার্য নিয়োগ—একাধিক ইস্যুতে তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে রাজভবনের আইনি লড়াই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
সামনেই ২০২৬ সালের মেগা বিধানসভা নির্বাচন। এই হাই-ভোল্টেজ রাজনৈতিক আবহে পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি স্পর্শকাতর রাজ্যে আর এন রবি কীভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন দাঁড়ায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x