কিছু ক্ষত কখনো শুকায় না, কিছু আর্তনাদ আদালতের চার দেওয়াল ছাড়িয়ে অনন্তকাল ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ২০২০ সালের জুন মাস, তামিলনাড়ুর থুথুকুডি জেলার সাথানকুলামের আকাশ-বাতাস এমনই এক বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল। সেলভামানি নামে এক মা হারিয়েছিলেন তাঁর স্বামী এবং আদরের সন্তানকে—একই সাথে, এক অভিশপ্ত রাতে।
যাদের দায়িত্ব ছিল সাধারণ মানুষকে বুকে আগলে রাখার, তারাই যখন পিশাচের রূপ ধরে, তখন সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইবে? দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, মাদুরাই আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে ৯ জন পুলিশ কর্মীর মৃত্যুদণ্ড সেই প্রশ্নেরই এক যুগান্তকারী উত্তর দিয়ে গেল। আসুন ফিরে দেখি সেই ভয়াল রাত থেকে সুবিচারের দিন পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী যাত্রার গল্প।

একটি সাধারণ পরিবার এবং এক অভিশপ্ত লকডাউনের রাত

পি. জয়রাজ (৫৯) এবং তাঁর ছেলে জে. বেনিক্স (৩১)—সাথানকুলামের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই নিজেদের মোবাইল এবং কাঠের জিনিসপত্রের দোকান চালিয়ে হাসিখুশিতে দিন কাটাচ্ছিলেন। সময়টা ছিল করোনা মহামারীর কঠোর লকডাউনের। ১৯ জুন ২০২০, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত। অভিযোগ, লকডাউনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও দোকান খোলা রাখার ‘অপরাধে’ পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে যায় থানায়।
কে জানত, সামান্য একটা ভুলের এমন নির্মম, অমানবিক পরিণতি হতে পারে?

থানার বন্ধ দরজার ওপাশে পৈশাচিক উল্লাস

থানার চার দেওয়ালের ভেতরে সেদিন যা ঘটেছিল, তা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়। ক্ষমতার অহংকারে মত্ত হয়ে কয়েকজন উর্দিধারী পুলিশ অফিসার পিতা-পুত্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সারারাত ধরে চলেছিল অকথ্য অত্যাচার। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাদের চিৎকারে থানার বাইরের বাতাসও যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ছেলে বেনিক্সের চোখের সামনে বাবা জয়রাজকে নির্মমভাবে পেটানো হয়, আর বাবার সামনে ছেলেকে। পুলিশি হেফাজতে তাদের ওপর এমন পাশবিক এবং যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, যা বর্ণনা করার ভাষা সভ্য সমাজে নেই। রক্তে ভেসে গিয়েছিল থানার মেঝে। গুরুতর আহত, রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের যখন জেলে পাঠানো হয়, ততক্ষণে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ মৃত্যুর দিন গুনছে। ২২ ও ২৩ জুন পর পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পিতা ও পুত্র। সেলভামানির পৃথিবী এক নিমেষে শ্মশানে পরিণত হয়।

তদন্তের মোড় এবং কনস্টেবল রেবতীর সাহসী পদক্ষেপ

প্রাথমিকভাবে পুলিশ প্রশাসন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ এবং মাদ্রাজ হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে মামলাটির তদন্তভার সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এই মামলার টার্নিং পয়েন্ট ছিলেন সাথানকুলাম থানারই এক জুনিয়র হেড কনস্টেবল, রেবতী। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু এবং নিজের চাকরি ও পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ওই রাতের ভয়াবহতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন। তিনি জানান কীভাবে সারারাত ধরে জয়রাজ ও বেনিক্সকে নির্মমভাবে পেটানো হয়েছিল এবং সিসিটিভি ফুটেজে উপস্থিত অভিযুক্তদের তিনি নির্ভয়ে শনাক্ত করেন। তাঁর এই সাহসী সাক্ষ্যই অভিযুক্তদের শাস্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

চার্জশিট ও অভিযুক্তরা

দীর্ঘ তদন্তের পর সিবিআই খুনের ধারা (Section 302), প্রমাণ লোপাট (Section 201), অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র (Section 120-B) সহ ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক কড়া ধারায় চার্জশিট পেশ করে।
প্রাথমিকভাবে ১০ জন পুলিশ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু পলদুরাই নামে এক অভিযুক্ত ২০২০ সালের আগস্ট মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাকি যে ৯ জন অফিসারের বিচারপ্রক্রিয়া চলে, তারা হলেন:
  • এস. শ্রীধর (ইন্সপেক্টর এবং তৎকালীন এসএইচও)
  • পি. রঘুগনেশ (সাব-ইন্সপেক্টর)
  • কে. বালাকৃষ্ণান (সাব-ইন্সপেক্টর)
  • এস. মুরুগান (হেড কনস্টেবল)
  • এ. সামাদুরাই (হেড কনস্টেবল)
  • এম. মুথুরাজা (পুলিশ কনস্টেবল)
  • এস. চেল্লাদুরাই (পুলিশ কনস্টেবল)
  • এক্স. টমাস ফ্রান্সিস (পুলিশ কনস্টেবল)
  • এস. ভেলুমুথু (পুলিশ কনস্টেবল)

ঐতিহাসিক রায়: ‘বিরল থেকে বিরলতম’

প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বিচার প্রক্রিয়ার পর, ২৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে মাদুরাইয়ের বিশেষ আদালত ৯ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করে। এরপর ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিচারপতি জি. মুথুকুমারান তাঁর চূড়ান্ত এবং যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
বিচারক তাঁর রায়ে স্পষ্ট জানান যে, যাদের ওপর আইনশৃঙ্খলার রক্ষার দায়িত্ব ছিল, তারাই চরমভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করেছে। আদালত এই ঘটনাটিকে “বিরল থেকে বিরলতম” (Rarest of the Rare) অপরাধের তকমা দিয়ে ৯ জন পুলিশ কর্মীর প্রত্যেককেই মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির আদেশ দেয়।
পাশাপাশি, আদালত নির্দেশ দেয় যে দোষী পুলিশ অফিসারদের মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যৌথভাবে ১.৪০ কোটি টাকা প্রদান করতে হবে।

শেষ কথা: চোখের জলে লেখা এক নতুন অধ্যায়

সাথানকুলামের এই রায় শুধু একটি আইনি জয় নয়, এটি ক্ষমতার আস্ফালনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক বিশাল জয়। ৯ পুলিশের একযোগে ফাঁসির এই রায় ভারতের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল।
বেনিক্স আর জয়রাজ হয়তো আর কোনোদিন তাদের সেই ছোট্ট দোকানে ফিরে আসবে না। সেলভামানির চোখের জল হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি শুকোবে না। তবে ফাঁসির সেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসে থাকা ওই ৯ জন অপরাধী আজ অন্তত এটা বুঝতে পারছে যে—উর্দির আড়ালে লুকিয়ে অপরাধ করলে আইন কাউকে ক্ষমা করে না। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজ আরও একটু মজবুত হলো। সাথানকুলামের মাটি আজ শান্তিতে শ্বাস নিচ্ছে।
4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Saju Bairagi
Admin
2 days ago

রায় হয়ে গেলো,মানেই কি ওই ভুক্তভোগী পরিবার বিচার পেয়ে গেলো? এখনও এই রায়ের যে অনেক ঘাটের জল খাওয়া বাকি,তারপর কার্যকর হলেও সমাজে বিশেষ করে এই ধরনের পুলিশের কোনো মানসিক পরিবর্তন হবে বলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি না।
এরা যেমন বাবা ছেলেকে মেরেছে/মারতে মারতে যে মানসিক যন্ত্রণা বাবা ছেলেকে দিয়েছে সেটা জাস্ট সবার সামনে এই পিচাশ গুলোর বাবা মা/অথবা ওদের ছেলেদের বেশি না মাত্র এক মিনিট এলোপাথাড়ি পিটাতে হবে আর ওদের সাজা হচ্ছে দাঁড়িয়ে সেটা দেখবে।
ওফ আমরা তো আবার গণতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থায় মোড়ানো সমাজে বাস করি,এসব বললে আবার 🤫

আপনাদের মূল্যবান বক্তব্য বা মতামত জানার আগ্রহে রইলাম।

Last edited 2 days ago by Saju Bairagi
Priyanti
Guest
Priyanti
2 days ago

হৃদয়বিদারক ঘটনা😥

Saju Bairagi
Admin
2 days ago
Reply to  Priyanti

🥲🥲🥲

Haimanti
Guest
Haimanti
2 days ago

মানুষকে টর্চার করেও যে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া যায়,এমন যুগ দেখতে হচ্ছে😞ওই ১০ জন পুলিশের কারও ভিতরে কি একটুও বিবেক নাড়া দিলো না?এটা ভেবেই আঁতকে উঠছি।

Saju Bairagi
Admin
2 days ago
Reply to  Haimanti

বাবা আর ছেলেকে একসাথে,এক জায়গায় বসে বিষয়টা কল্পনাই করতে কেমন লাগে😭

5
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x