কাজের শেষে যখন দিন ফুরিয়ে আসে, আর পড়ন্ত রোদে বিকেলের বারান্দায় এসে দাঁড়াই, তখন মাঝে মাঝেই মনে হয়—এই যে এত ছুটছি, এত কিছু পাওয়ার লড়াই, এর শেষে আসলে আমরা কোথায় ফিরতে চাই? কোথায় গিয়ে সব ক্লান্তি হঠাৎ করে ধুয়ে যায়?
উত্তরটা খুব সোজা, আর শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট। 'মা'।
আমাদের সবার ঘরেই এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি কোনোদিন নিজের জন্য বাঁচেননি। নিজের শখ, আহ্লাদ, আর সমস্ত না-পাওয়াগুলোকে যিনি খুব সন্তর্পণে নিজের শাড়ির খুঁটে বেঁধে রাখেন। সারাজীবন নিজের দুঃখগুলোকে ওই আঁচলেই লুকিয়ে রেখে, শুধু আমাদের জন্য একটা নরম সুখের চাদর বুনে যান তিনি। আর আমরা, সেই চাদর গায়ে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ভাবি, পৃথিবীটা বড্ড শান্তির! ছেঁড়া শাড়িটা পরে যিনি হাসিমুখে বলে দেন, "আমার তো আর বাইরে যাওয়ার নেই, আমার এটাই চলবে, তুই বরং নতুন জামাটা নিয়ে নে"—সেই মানুষটার ওই মিথ্যে কথাটার মাঝে যে কত বড় সত্যি আর কত গভীর আত্মত্যাগ লুকিয়ে থাকে, তা বুঝতে বুঝতে আমাদের অনেক বয়স পেরিয়ে যায়।

আজ মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার, ক্যালেন্ডারের পাতায় যাকে আমরা 'বিশ্ব মা দিবস' বলি। কিন্তু জানেন কি, এই দিনটার জন্ম কোনো উৎসবের আনন্দ থেকে হয়নি? হয়েছিল এক মেয়ে আর তার মায়ের অবিচ্ছেদ্য এক ভালোবাসার গল্প থেকে।

গল্পটা বিশ শতকের শুরুর দিকের, আমেরিকার। অ্যানা জার্ভিস নামের এক নারী তাঁর মাকে বড্ড ভালোবাসতেন। তাঁর মা সারাজীবন সমাজসেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে যখন অ্যানার মা মারা যান, মেয়েটি ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে পড়ে। মায়ের এই নিঃস্বার্থ জীবন আর ভালোবাসাকে সম্মান জানাতে অ্যানা একটি বিশেষ দিনের স্বপ্ন দেখেন। মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে গির্জায় উপস্থিত সবাইকে তিনি উপহার দেন ৫০০টি সাদা কার্নেশন ফুল—কারণ ওটা ছিল তাঁর মায়ের ভীষণ প্রিয়। অ্যানা লড়াই শুরু করেন যাতে ক্যালেন্ডারের পাতায় অন্তত একটা দিন শুধু মায়েদের জন্য বরাদ্দ থাকে। অ্যানার সেই একবুক ভালোবাসা আর জেদই ১৯১৪ সালে স্বীকৃতি পায়, জন্ম নেয় 'মা দিবস'।
আমেরিকার সেই গল্পটা আজ পৃথিবীর সব ঘরের গল্প। ইতিহাস বইয়ে হয়তো বড় বড় যুদ্ধের কথা লেখা থাকে, কিন্তু জ্বর এলে কপালে রাখা মায়ের ওই ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ, কিংবা স্কুল থেকে ভিজে আসার পর তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছিয়ে দেওয়ার যে মহাকাব্য, তা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।
আমরা বড় হয়ে যাই। আমাদের ব্যস্ততা বাড়ে, আমরা স্মার্টফোন আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে রাখি। আর ওদিকে রান্নাঘরের ধোঁয়ায়, সংসারের যাঁতাকলে একটু একটু করে মায়ের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়। বয়সের ভারে হাঁটুটা ব্যথা করে। তবু রাতে বাড়ি ফিরে যখন বলি, "উফ! বড্ড ক্লান্ত লাগছে", ওই ব্যথার শরীর নিয়েই এক কাপ গরম চা আর অদ্ভুত এক জাদুকরী হাসি নিয়ে তিনি সামনে এসে দাঁড়ান। নিমেষে আমাদের সব ক্লান্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়!
আজকের এই দিনে, আসুন না একটু অন্যরকম কিছু করি। আজ কোনো দামি রেস্তোরাঁ নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো লম্বা স্ট্যাটাস নয়। আজ বরং মায়ের পাশে গিয়ে একটু চুপ করে বসি। তাঁর ওই বলিরেখা পড়া হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলি—"মা, তুমি আছো বলেই আমার পৃথিবীটা এত সুন্দর।" দেখবেন, ওই কথাটুকু শুনেই মানুষটার চোখে জল আর মুখে অদ্ভুত তৃপ্তির একটা হাসি ফুটে উঠবে।
আর যাঁদের মা আজ আর পৃথিবীতে নেই, তাঁরা হয়তো আজ আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটার দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলবেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ওই তারার আলোতেও মায়ের সেই চিরচেনা হাসিমুখটাই লুকিয়ে আছে। মায়েদের কোনো মৃত্যু হয় না, তাঁরা মিশে থাকেন আমাদের অস্তিত্বে, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে।

মায়ের আঁচলের ছায়া আর ভালোবাসা সবার জীবনে এভাবেই থাকুক। হাসিমুখে বাঁচুন, আর আপনার বেঁচে থাকার কারণ যিনি, তাঁকে বড্ড ভালো রাখুন।

মায়ের সাথে কাটানো সুন্দর বা মজার মুহূর্ত কমেন্টে শেয়ার করুন । পড়ার অপেক্ষায় রইলাম ।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x