মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি গত কয়েক দশকে এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি, যতটা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক নজিরবিহীন যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর, পুরো বিশ্ব এখন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু কী ঘটেছিল সেই রাতে? কেন এই হামলা? এবং এর পরিণতিই বা কী হতে চলেছে? চলুন, বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যাক।
কী ঘটেছে? (আসল ঘটনা)
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের (Mossad) নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতে তেহরানে একটি আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়।
অপারেশনের নাম: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) এবং ইসরায়েল এর নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ (Operation Roaring Lion)।
লক্ষ্যবস্তু: তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের অত্যন্ত সুরক্ষিত গোপন বাসভবন।
ফলাফল: এই হামলায় খামেনেই সহ ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনাপ্রধান এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
কীভাবে শুরু হলো এই সংঘাত? (প্রেক্ষাপট)
এই সংঘাত একদিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং ছায়াযুদ্ধের (Proxy War) চূড়ান্ত পরিণতি।
দীর্ঘদিন ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য হামাস (ফিলিস্তিন), হিজবুল্লাহ (লেবানন) এবং হুথি (ইয়েমেন) বিদ্রোহীদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে আসছিল। অন্যদিকে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের আশঙ্কা ছিল যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলের ওপর ইরানের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত হামলার পর, আমেরিকা এবং ইসরায়েল সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রক্সি যুদ্ধ নয়, এবার সরাসরি আঘাত হানতে হবে। গোয়েন্দারা যখন খামেনেইয়ের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন, তখনই এই চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
কেন এই হামলা? মার্কিন ও ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুগপৎ হামলার পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে:
১. শাসনব্যবস্থার পতন (Regime Change): মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই হামলার অন্যতম লক্ষ্য হলো ইরানে বর্তমান কট্টরপন্থী ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং সেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ তৈরি করা।
২. পারমাণবিক হুমকি নির্মূল: ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া। শীর্ষ নেতৃত্বকে শেষ করার মাধ্যমে তারা ইরানের নিউক্লিয়ার কমান্ড চেইন ভেঙে দিতে চেয়েছে।
৩. প্রক্সি নেটওয়ার্ক ধ্বংস: খামেনেই ছিলেন ইরানের সমস্ত প্রক্সি ফোর্সের মূল নিয়ন্ত্রক। তাকে হত্যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয় ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইরানের পালটা আঘাত: যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি
খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরান নীরব বসে নেই। তারা ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব গঠন করে ভয়াবহ প্রতিশোধের পথে হেঁটেছে। ইতিমধ্যেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও মিত্রদের ঘাঁটিগুলোতে (কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলে) শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, এই পালটা হামলায় অন্তত চারজন মার্কিন সেনা নিহত এবং বহু আহত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইরানের সামরিক ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব
এই যুদ্ধের আঁচ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, পুরো বিশ্ব এর ফল ভোগ করছে:
জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রাতারাতি ৮-৯% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি না শোধরালে বিশ্বব্যাপী পেট্রোল-ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে।
বিমান চলাচলে ভয়াবহ বিপর্যয়: দুবাই, আবুধাবি, কাতার এবং ইসরায়েল সহ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
শেয়ার বাজারে ধস: যুদ্ধের আশঙ্কায় ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন (Crash) দেখা দিয়েছে। মার্কিন ডাও জোন্স সূচক ৫০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে গেছে।
ভবিষ্যৎ কী? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা?
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইরানে এখন যে বিশাল নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে লেবানন, ইয়েমেন এবং সিরিয়া সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যা এটিকে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে (Regional War) পরিণত করবে। রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো যদি এই সংঘাতে কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করে, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেও মোড় নিতে পারে বলে অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল কবে নিভবে, তা এখন আর কারও জানা নেই। তবে এই সংঘাত যে পৃথিবীর মানচিত্র এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে যাবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

খুবই ভয়ংকর খেলা শুরু হয়েছে।
[…] ⇒ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট জানতে পড়ুন 0 0 votes Article Rating […]